বর্ষায় করোনার সঙ্গে বাড়ছে ডেঙ্গু, সামালে প্রত্যয়ী সংশ্লিষ্টরা
আসাদুল ইসলাম দুলাল: দেশে বর্ষা মৌসুমে মহামারী করোনাভাইরাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা। ঊর্ধ্বমুখী শনাক্তের এই ধারা অব্যাহত থাকলে করোনা ও ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তবে এ বিষয়ে প্রস্তুতিও রয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১২৬ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। এর পরের তিন মাসে ২৫ এর কোটায় চলে আসে। তবে এর পর থেকেই দেখা দেয় ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। পরিসংখ্যা অনুযায়ী, গত মে মাসে ১৬৩ জন ও জুনে এখন পর্যন্ত ২৫৫ জন ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। গত তিন দিনে সারাদেশে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক নিয়মিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ভাইরাসটিতে এখনো প্রাণহানি ঘটেনি। তবে বর্ষার শুরু থেকেই এতে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে।
ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার শঙ্কা
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হতে পারে। এটা রাজধানীসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এই মুহূর্তে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা দরকার। যেসব স্থানে মশা জন্মায়, সেসব স্থানে পাত্র অপসারণ করতে হবে। এ ছাড়া কীটনাশক ব্যবহার করে মশা মেরে ফেলা দরকার। এতে জনগণের সম্পৃক্ততার পাশাপাশি সচেতনতাও দরকার, যেন সাধারণ মানুষ তাদের নিজ বাড়িতে এমন কোনো জায়গা না রাখে, যেখানে পানি জমে এডিস মশা বংশ বিস্তার ও ডেঙ্গু ছড়ানোর সুযোগ পায়।’
ডেঙ্গু মোকাবিলা বিষয়ে অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ‘জনগণ, সিটি কর্পোরেশন ও মশা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ যদি একযোগে কাজ করে, তাহলে এটার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে।’
সতর্কবার্তা কি হতে পারে জানতে চাইলে এই কীটতত্ত্ববিদ আরও বলেন, ‘গত দুই বছরের চেয়ে এবার ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হবে। ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপ আছে। এর মধ্যে ডেনভি–১, ডেনভি–২, ডেনভি–৩ ও ডেনভি–৪। এই চারটির মাধ্যমে ডেঙ্গু জ্বর হয়। কোনো কোনো বছর একটা সেরোটাইপ প্রভাব বিস্তার করে। যেমন গত বছর সেরোটাইপ ডেনভি–৩ প্রভাব বিস্তার করেছিল। সাধারণত ডেঙ্গু শনাক্তের সময় এটা শনাক্ত করা হয় না যে, কোন সেরোটাইপ দ্বারা রোগী আক্রান্ত হচ্ছেন। এটা গবেষণার উদ্দেশে অনেকে করেন। অন্যথায় এটা করা হয় না। শুধুমাত্র শনাক্ত রেকর্ডে বলা হয় ডেঙ্গু জ্বর।’
এদিকে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে বাড়ছে বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের প্রকোপ।
এ বিষয়ে সোমবার (১৩ জুন) স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘কোভিড-১৯ কিছুটা বেড়েছে। এজন্য সতর্ক হতে হবে। মাস্ক পরতে হবে, সামাজিক দূরত্ব ভুলে গেলে হবে না। রোগী বাড়ছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত একদিনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১৬২ জন, যা গত ৮৩ দিনের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত। এর আগে গত ২৩ মার্চ ১৩৪ জনের দেহে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছিল। এরপর একদিনে দেশে এতো রোগী শনাক্ত হয়নি।
মঙ্গলবার (১৪ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে নতুন করে ১৬২ জন রোগী শনাক্ত হন। এদের মধ্যে ১৪৯ জনই ঢাকা জেলার। এ নিয়ে দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়ে ১৯ লাখ ৫৪ হাজার ৪০৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আগের তুলনায় টানা ১২ দিন নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গত তিন দিনে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৩৯৯ জন। এর মধ্যে ১২ জুন ১০৯ জন, ১৩ জুন ১২৮ জন এবং ১৪ জুন ১৬২ জনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে।
প্রতি বছর বর্ষাকালে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। গত বছরের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত হাসপাতালে সর্বোচ্চ সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী ভর্তির পাশাপাশি মারাও যায়। অন্যদিকে ওই বছরের জুন, জুলাই মাসে করোনার সর্বোচ্চ শনাক্ত দেখেছে দেশবাসী।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শারমিন সুলতানা জেবা মেডিভয়েসকে বলেন, ‘বর্ষাকাল আসছে তাই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। ২০২০-২১ সালে কোভিড অবস্থা যদি দেখি, তাহলে দেখা যাবে জুলাই মাসে শনাক্তের পরিমাণ বাড়ে। এখন আস্তে আস্তে বাড়ছে অর্থাৎ ওই প্রবণতা শুরু হচ্ছে। এইভাবে এটা বাড়বে। জুলাইয়ে দেখা যাবে করোনার সংক্রমণ ও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে। এখন যদি নতুন ভ্যারিয়েন্ট শুরু হয়, সেক্ষেত্রে কিছু বলা যাবে না। কিন্তু ছড়িয়ে পড়লে এই পিকটা বেড়ে আবার কমে যাবে। যেহেতু এই প্রবণতা মাত্র শুরু হয়েছে। তাই কয়েক দিন বিষয়টি লক্ষ্য রাখতে হবে।’
সচেতনতা বিষয়ে ডা. শারমিন সুলতানা বলেন, ‘আমাদের সচেতন থাকতে হবে। করোনা প্রতিরোধে মাস্ক পড়তে হবে। অনেকে মাস্ক পড়া ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে ভ্যাকসিন নিয়েছেন বলে মনে করছেন, তাদের করোনা হবে না। মশা নিধন কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি মশারি খাটিয়ে ঘুমাতে হবে। কোনো স্থানে পানি জমা রাখা যাবে না। হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। জনসমাগম বা ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। তাহলে করোনা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তবে ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।’
সক্ষমতার বিষয়ে জানতে চাইলে এই ভাইরোলজিস্ট বলেন, ‘আমাদের সক্ষমতা আছে। করোনার সংক্রমণ ও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও কোনো সমস্যা হবে না। এর আগে যখন করোনা ও ডেঙ্গু পিক হয়েছিল, তখন আমরা সাপোর্ট দিয়েছি। এখনো সাপোর্ট দিবো ইনশাল্লাহ।’
২০১৯ সালে ডেঙ্গু জ্বরে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আক্রান্ত হয়েছিল এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। আর গত বছর এ রোগে মারা গেছেন ১০৫ জন এবং আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন।
সমস্যা দেখছে না স্বাস্থ্য প্রশাসন
এ বিষয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পরিচালক ডা. মিজানুর রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এখন ডেঙ্গুর প্রকোপ উর্ধ্বমুখী। এই প্রবণতা এখনও অব্যাহত। বর্ষাকালে সাধারণত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। কারণ এ সময় বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকার ফলে ডেঙ্গুর বংশ বিস্তার ঘটে, ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। আবার করোনার শনাক্ত বাড়ছে, যা ইমিউনিটির উপর নির্ভর করে। সবার ইমিউনিটি এক নয়, কারও কম-বেশি থাকতে পারে। এ ছাড়া যাদের বুস্টার ডোজ বাকি রয়েছে তাদের সংক্রমণ বাড়ছে। তবে বুস্টার ডোজ নেওয়া হলে, এটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।’
সচেতনতা বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘এখানে সচেতনতা খুব জরুরি। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় ও বাড়িওয়ালাদের এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে, যেন ডাবের খোসা, গাড়ির টায়ার, ফুলের টব ও থানায় পুরাতন গাড়িতে বা কোথাও কোনো প্রকার পানি জমে না থাকে, সেই বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। তাহলে ভবিষ্যতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. মিজানুর বলেন, ‘আমাদের করোনা নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে। আমাদের প্রথমদিকে যে সমস্যাগুলো ছিলো, তা এখন নেই। সবকিছু আমাদের নাগালের মধ্যে রয়েছে। তাই এটাকে আমরা আপাতত কোনো সমস্যা মনে করছি না।’
ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। এখানে সে সকল চিকিৎসক ও নার্স রয়েছে, তারা সবাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। সুতরাং এখানে কোনো সমস্যা হবে না।’
এমইউ